ও৩ম্
ভূমিকা
বেদ হলো বিশ্বের প্রাচীনতম
ধর্মগ্রন্থ, যা মানবজাতির সর্বজনীন
কল্যাণের জন্য ঈশ্বরের দ্বারা
প্রণীত। বেদে বিজ্ঞান, ধর্ম,
নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের
সমন্বয়ে এমন উপদেশ প্রদান
করা হয়েছে যা শুধু প্রাচীনকালে
নয়, আজকের আধুনিক যুগেও প্রাসঙ্গিক। ঈশ্বর, যিনি সর্বজ্ঞ এবং
সর্বশক্তিমান, তাঁর জ্ঞান সম্পূর্ণ,
ত্রুটিমুক্ত এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনহীন।
এ কারণে, বেদকে চিরন্তন এবং শাশ্বত জ্ঞান
হিসেবে গণ্য করা হয়,
যা সৃষ্টির আদিতে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সমস্ত মানবজাতির
জন্য প্রযোজ্য।
এ লেখায় বেদকে কেন ঈশ্বরীয় জ্ঞান
হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত তা বিশ্লেষণ
করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগ্রন্থের সাথে তুলনা করে
বেদকে ঈশ্বরীয় জ্ঞানের সঠিক মানদণ্ড হিসেবে
দেখানো হয়েছে।
ঈশ্বরীয় জ্ঞানের সম্পর্ক
ইশ্বরীয় জ্ঞানের সম্পর্কে একটি প্রশ্ন সামনে
আসে যে ভিন্ন ভিন্ন
মতের লোকেরা তাদের নিজেদের ধর্মীয় বইগুলিকে ঈশ্বরীয় জ্ঞান বলে দাবি করেন।
যেমন, খ্রিষ্টানরা বাইবেলকে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কুরআনকে, পারসি ধর্মাবলম্বীরা জেন আবেস্তাকে এবং
হিন্দুরা বেদকে ঈশ্বরীয় জ্ঞান বলে মনে করেন।
এমন অবস্থায়, কোনটি ঈশ্বরীয় জ্ঞান এবং কোনটি নয়,
তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ প্রশ্নের উত্তর হলো যে, প্রথমে
কোন ধর্মের গ্রন্থকে তার অনুগামীদের দাবির
ভিত্তিতে ঈশ্বরীয় জ্ঞান বলা যাবে না।
আমাদের তার দাবির পরীক্ষা
করতে হবে এবং কিছু
পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে পরখ করতে
হবে। যে ধর্মীয় বইগুলি
ঐ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, সেগুলোকেই আমরা
ঈশ্বরীয় গ্রন্থ মনে করব, অন্যথায়
সেগুলি মানব-কৃত বলে
বিবেচিত হবে।
১. ঈশ্বরীয় জ্ঞান সৃষ্টির আরম্ভে আসা উচিত
ঈশ্বর সর্বসাধারণের পিতা এবং সকল
মানুষের কল্যাণ চান। একমাত্র বেদই
হলো যা সৃষ্টির আরম্ভে
ঈশ্বর দ্বারা মানবজাতিকে দেওয়া হয়েছিল। বাইবেল প্রায় ২০০০ বছর পুরনো,
কুরআন প্রায় ১৪০০ বছর পুরনো,
এবং জেন আবেস্তা প্রায়
৪০০০ বছর পুরনো। এইভাবে
অন্যান্য ধর্মগ্রন্থও একইরকম। মানব সৃষ্টির ইতিহাস
কয়েক কোটি বছর পুরনো,
অথচ আধুনিক বিজ্ঞানের মতে, মানবের উৎপত্তি
মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। যখন
প্রথম সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছিল, তখন
মানুষ কোনো শিক্ষা ছাড়াই
কিছু শিখতে পারতো না। তাই মানবের
উৎপত্তির সাথে সাথেই তাকে
ঈশ্বরীয় জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল। সত্যের অভিজ্ঞতা
না থাকার কারণে, যদি সৃষ্টির প্রাচীন
কালে মানুষ কোনো অমানবিক আচরণ
করে, তাহলে তার ফল তাকে
কেন ভোগ করতে হবে?
কারণ সে অমানবিক আচরণের
জন্য দায়ী নয়, কারণ যদি
কোনো দায় থাকে, তা
হলে তা ঈশ্বরেরই হবে,
কারণ তিনি মানবকে শুরুতেই
সত্যের জ্ঞান দেননি।
(নোট ১)
উপরোক্ত যুক্তি অনুসারে, বাইবেলে বর্ণিত আদম ও হাওয়ার
কাহিনী যদি আমরা পরীক্ষা
করি, তাহলে দেখা যায় যে,
ঈশ্বর প্রথম সত্যের ফলের গাছ লাগান,
তারপর আদম ও হাওয়াকে
সৃষ্টি করে তাদের গাছের
ফল খেতে নিষেধ করেন।
এরপর হাওয়া সাপের প্ররোচনায় গাছের ফল খেয়ে তাদের
নগ্নতা জানার ফলে ঈশ্বর তাকে
পাপী বলে অভিহিত করেন,
তাকে প্রসব বেদনার অভিশাপ দেন এবং সাপকে
চিরকাল রেঙে বেড়ানোর অভিশাপ
দেন। এটি বিশ্বাসযোগ্য বলে
মনে হয় না, কারণ
ঈশ্বরের কাজই হলো মানুষের
জ্ঞান দেওয়া, আর যদি মানুষের
উৎপত্তির পরে তাকে জ্ঞান
না দিয়ে অভিশাপ দেওয়া হয়, তাহলে বাইবেলকে
ঈশ্বরীয় গ্রন্থ বলে সন্দেহ তৈরি
হয়।
আমাদের এই দাবির সমর্থনে,
মেক্স মুলার (Max Muller) তার "ধর্ম বিজ্ঞান" (Science of Religion) বইতে বলেছেন, "যদি
আকাশ এবং পৃথিবীর রচয়িতা
কোনো ঈশ্বর থাকে, তবে তার জন্য
এটি অন্যায় হবে যে তিনি
মূসার জন্মের লক্ষ লক্ষ বছর
আগে জন্মগ্রহণ করা আত্মাদের তার
জ্ঞান থেকে বঞ্চিত রাখেন।
যুক্তি এবং ধর্মের তুলনামূলক
অধ্যয়ন উভয়ই বলছে যে ঈশ্বর
মানব সৃষ্টির শুরুতেই তার ঈশ্বরীয় জ্ঞান
মানুষকে দিয়েছেন।"
বেদের অতিরিক্ত, অন্য কোনো ধর্মীয়
গ্রন্থ সৃষ্টির আরম্ভে আসেনি। অতএব, বেদকে এই পরীক্ষার ভিত্তিতে
ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গন্য করা যেতে
পারে, অন্যগুলিকে নয়।
২. ঈশ্বরীয় জ্ঞানের গ্রন্থে কোনো দেশের ভূগোল
বা ইতিহাস থাকা উচিত নয়
ঈশ্বরীয় জ্ঞানের ধর্মগ্রন্থ সমগ্র মানবজাতির জন্য হওয়া উচিত,
কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভূগোল বা ইতিহাসের উপর
ভিত্তি করে নয়। যদি
আমরা কুরআন বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে
পাই যে এটি বিশেষভাবে
আরব দেশের ভূগোল এবং মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনচরিতকে কেন্দ্র
করে লেখা হয়েছে। আবার,
বাইবেল মূলত প্যালেস্টাইন (ফিলিস্তিন)
দেশের ভূগোল এবং ইহুদিদের জীবনের
উপর কেন্দ্রিত। এই থেকে এটা
বোঝা যায় যে, ঈশ্বর
কুরআনকে আরব দেশের জন্য
এবং বাইবেলকে ফিলিস্তিন দেশের জন্য রচনা করেছেন।
অন্যদিকে, বেদে কোনো বিশেষ
দেশ, জাতি বা ব্যক্তির
জন্য লেখা হয়নি। বেদের
জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রকাশিত হয়েছে।
অতএব, বেদকেই ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
পশ্চিমা ও কিছু ভারতীয়
পণ্ডিতেরা যারা বেদে ইতিহাস
থাকার কথা বলেন, তারা
বেদের প্রকৃত অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে
পারেননি। ইতিহাস তখনই তৈরি হয়
যখন কোনো নির্দিষ্ট সময়
বা কাল অতিক্রম করে।
বেদের উৎপত্তি সৃষ্টির শুরুতে হয়েছে, তাই তার আগে
কোনো ইতিহাস থাকার প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং,
বেদই ঈশ্বরীয় জ্ঞানের গ্রন্থ, কারণ এতে কোনো
দেশের ভূগোল বা ইতিহাস নেই।
৩. ঈশ্বরীয় জ্ঞান কোনো বিশেষ দেশের
ভাষায় নয়
ঈশ্বরীয় জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য দেওয়া হয়েছে।
অতএব, এর প্রকাশ কোনো
একটি নির্দিষ্ট দেশের ভাষায় হওয়া উচিত নয়। যদি
কোনো একটি দেশের ভাষায়
প্রকাশিত হয়, তাহলে সেই
দেশ বা অঞ্চলের মানুষই
কেবল তার সুবিধা পাবে,
অন্যরা বঞ্চিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন
আরবি ভাষায় রচিত এবং বাইবেল
হিব্রু ভাষায়।
অন্যদিকে, বেদের ভাষা হল বৈদিক
সংস্কৃত, যা সৃষ্টির আদিকালীন
ভাষা হিসেবে বিবেচিত। তখন পৃথিবীতে অন্য
কোনো ভাষা ছিল না,
তাই বেদগুলোও সেই প্রথম ভাষা,
বৈদিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, যা পৃথিবীর সব
মানুষের জন্য অভিন্ন ছিল।
পরে পৃথিবীর সকল ভাষাই সংস্কৃত
ভাষা থেকে বিকৃত হয়ে
সৃষ্টি হয়েছে।
স্বামী দয়ানন্দ তাঁর "সত্যার্থ প্রকাশ" গ্রন্থের সপ্তম সমুল্লাসে উল্লেখ করেছেন: “যদি ঈশ্বর কোনো
একটি দেশের ভাষায় জ্ঞান দিতেন, তাহলে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হতেন,
কারণ সেই দেশের মানুষের
জন্য এটি সহজ হত,
আর বিদেশীদের জন্য কঠিন। তাই
ঈশ্বর সেই ভাষা বেছে
নিয়েছেন, যা কোনো বিশেষ
দেশের ভাষা নয় এবং
যে ভাষা সব দেশের
মানুষের জন্য সমান। ঈশ্বরের
তৈরি পৃথিবী যেমন সবার জন্য
সমান, তেমনি ঈশ্বরের জ্ঞানের ভাষাও এমন হওয়া উচিত,
যা সবার জন্য সমানভাবে
বোধ্য।”
এই যুক্তিতে, বেদকে ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, কারণ
এর ভাষা ছিল সর্বজনীন।
৪. ঈশ্বরীয় জ্ঞান পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা
থাকা উচিত নয়
ঈশ্বর পূর্ণ এবং সর্বজ্ঞ। তাঁর
কোনো কাজেই কোনো ত্রুটি বা
অপূর্ণতা থাকতে পারে না। তিনি
যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করেন, তা গভীরভাবে বিবেচনা
করে করেন, এবং এতে পরিবর্তনের
প্রয়োজন হয় না। যেমন
ঈশ্বর সৃষ্টির শুরুতে জীবমাত্রের কল্যাণের জন্য সূর্য, চন্দ্রসহ
অন্যান্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন, যা কখনো পরিবর্তনের
প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি
ঈশ্বরের জ্ঞানও সম্পূর্ণ এবং এতে কোনো
সংশোধনের প্রয়োজন নেই।
ধর্মগ্রন্থে, বিশেষ করে বাইবেলে, বিভিন্ন
স্থানে উল্লেখ আছে যে, ঈশ্বর
তাঁর ভুলের জন্য অনুশোচনা করছেন।
বাইবেলের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে
আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে
বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে,
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে, প্রথমে
আল্লাহ যবুর, তওরাত ও ইঞ্জিলের জ্ঞান
প্রকাশ করেছিলেন, পরে সেগুলো বাতিল
করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত কুরআন
অবতীর্ণ করেছেন।
যখন ম্যাক্স মুলার তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন
যে, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ হলো ঋগ্বেদ, তখন
থেকে কিছু মুসলিম (বিশেষ
করে ড. জাকির নায়েক)
এই মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেছেন
যে, ঋগ্বেদ যবুরেরও আগে অবতীর্ণ গ্রন্থ।
এ থেকে প্রশ্ন ওঠে,
ঈশ্বর কি পূর্ণ এবং
সর্বজ্ঞ নন, যে তিনি
মানবজাতির সৃষ্টির সময়ই পূর্ণ ও সত্য জ্ঞান
দিতে পারেননি? কেন তাঁকে বারবার
তাঁর কথা পরিবর্তন করতে
হয়েছিল? বাইবেল প্রায় ২০০০ বছর আগে
এবং কুরআন প্রায় ১৪০০ বছর আগে
আবির্ভূত হয়েছে, অর্থাৎ, যারা ২০০০ বছর
আগে জন্মগ্রহণ করেছেন তারা ঈশ্বরের জ্ঞান
থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। যদি তারা জ্ঞানের
অভাবে পাপ করে থাকে,
তাহলে তার শাস্তি কে
পাবে?
ঈশ্বরের একমাত্র জ্ঞান হলো বেদ, যা
সৃষ্টির শুরুতে দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো
পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়নি, কারণ বেদ পূর্ণ
এবং সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ
পর্যন্ত মানবজাতির পথপ্রদর্শন করবে। যেমন ঈশ্বর অনন্ত,
তেমনি তাঁর জ্ঞানও অনন্ত।
বেদের কোনো নীতির পরিবর্তন
প্রয়োজন হয়নি, তাই কেবল বেদকেই
ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
আরও একটি প্রশ্ন উদয়
হয় যে, মুসলিমরা কুরআনকে
আল্লাহর শেষ বাণী বলে
দাবি করে এবং বিশ্বাস
করে যে, এই শেষ
বার্তার পরে আল্লাহর পক্ষ
থেকে আর কোনো বার্তা
আসবে না। আমরা তাঁদের
কাছে একটি সহজ প্রশ্ন
রেখেছি, কী ভিত্তিতে তাঁরা
কুরআনকে শেষ উপদেশ বলে
দাবি করছেন? যদি ঈশ্বরীয় জ্ঞান
বারবার সংশোধন করা হয়, তবে
কেন কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর আর সংশোধনের
প্রয়োজন পড়বে না?
৫. ঈশ্বরীয় জ্ঞান সৃষ্টিকর্মের বিরুদ্ধ হওয়া উচিত নয়
ঈশ্বর সৃষ্টির কর্তা এবং তাঁর দ্বারা
সৃষ্ট জগতে একটি নির্দিষ্ট
শৃঙ্খলা বিদ্যমান, যেখানে সর্বত্রই একটি সুশৃঙ্খল নিয়ম
এবং ব্যবস্থাপনা কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ,
সূর্যের পূর্ব দিকে উদয় এবং
পশ্চিমে অস্ত হওয়া, মানুষের
জন্ম নেওয়া এবং পরিণামে মৃত্যুর
দিকে ধাবিত হওয়া। এত বিশাল এই
সৃষ্টিকে নিয়মাবদ্ধভাবে পরিচালনার জন্য ঈশ্বর এক
ধরনের শৃঙ্খলা এবং নিয়ম তৈরি
করেছেন, যা সৃষ্টিকে সুচারুভাবে
পরিচালিত করে। অতএব, ঈশ্বর
প্রদত্ত জ্ঞান এই নিয়মের বিপরীত
হতে পারে না।
যে কোনো ধর্মগ্রন্থ, যা
নিজেকে ঈশ্বরীয় জ্ঞান বলে দাবি করে,
সেই গ্রন্থের মধ্যে সৃষ্টির নিয়মের বিপরীত কিছু থাকতে পারে
না। কিন্তু বাইবেল এবং কোরানে ঈশ্বরের
সৃষ্টিকর্মের বিরোধী কিছু কথা পাওয়া
যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলে বলা হয়েছে যে
যিশু মেরির গর্ভে কোনো পুরুষের সম্পর্ক
ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেন। যিশু মৃতদের পুনরুজ্জীবিত
করেছিলেন, অন্ধদের চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং কোনো ওষুধ
ছাড়াই রোগীদের সুস্থ করেছিলেন। একইভাবে, কোরানে বলা হয়েছে যে
মূসা একটি পাথরে লাঠি
মারলে পানি প্রবাহিত হয়েছিল,
মুহাম্মদ (সাঃ) আঙ্গুলের ইশারায়
চাঁদকে দুই ভাগ করেছিলেন
এবং তিনি একটি মৃত
মেয়েকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
যে কোনো ধর্মগ্রন্থ যদি
ঈশ্বরের নামে চমৎকার ঘটনা
বা চমকপ্রদ কার্যকলাপ বর্ণনা করে, যা সৃষ্টিকর্মের
বিরোধী, তবে তাকে ঈশ্বরীয়
জ্ঞান বলা উচিত নয়।
যদি কেউ বলে যে
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান এবং তিনি যেকোনো
কিছু করতে পারেন, তবে
তা ভুল। কারণ ঈশ্বর
যদি নিজেই তাঁর তৈরি করা
নিয়ম ভঙ্গ করেন, তাহলে
তিনি সর্বজ্ঞ নয়।
ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান হওয়ার অর্থ এই নয়
যে তিনি এমন কোনো
কাজ করতে পারেন যা
সৃষ্টির শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যায়। সৃষ্টির রচনা, জীবনের উৎপত্তি, মানুষের জন্ম ও মৃত্যু,
এবং তাদের কর্মফল প্রদান করার মতো কাজগুলিতে
ঈশ্বরের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন
নেই।
বাইবেল, কোরান প্রভৃতি গ্রন্থে সৃষ্টির নিয়মের বিরুদ্ধে অনেক ঘটনা উল্লেখ
করা হয়েছে, যেগুলোকে চমৎকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং
তা ঈশ্বরের মহিমা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু এগুলো ঈশ্বরীয় জ্ঞান নয়। ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্ম
এবং তাঁর জ্ঞান মধ্যে
কোনো বৈপরীত্য থাকা উচিত নয়।
শুধুমাত্র
বেদই
একমাত্র
ধর্মগ্রন্থ
যা
সৃষ্টির
শৃঙ্খলা
ও
নিয়মের
বিরুদ্ধে
কোনো
কিছু
উল্লেখ
করে
না।
সুতরাং, শুধুমাত্র বেদকেই ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
৬. ঈশ্বরীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের বিরোধী হওয়া উচিত নয় এবং
এতে বিভিন্ন বিদ্যার বর্ণনা থাকা উচিত
আজকের যুগ বিজ্ঞানের যুগ।
সমগ্র মানব জাতি বিজ্ঞানের
আবিষ্কার ও পরীক্ষার মাধ্যমে
উপকৃত হচ্ছে। তাই ঈশ্বরীয় জ্ঞানও
সেই ধর্মগ্রন্থকেই বলা উচিত, যা
বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং
এতে বিদ্যার ভাণ্ডার থাকা উচিত। এতে
সকল বিদ্যার মৌলিক নীতির বর্ণনা থাকা উচিত, যা
মানবজাতির কল্যাণে কাজ করে। যেমন
সূর্য সকল প্রকার ভৌত
আলোয়ের মূল উৎস, তেমনি
ঈশ্বরের জ্ঞানও বিদ্যার আলোয়ের মূল উৎস হওয়া
উচিত।
যে ধর্মগ্রন্থগুলি বিজ্ঞানের বিপরীত কথা বলে, সেগুলি
ঈশ্বরীয় জ্ঞান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলের
বিশ্বাস অনুসারে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এই বিশ্বাসের কারণে
বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে (Galileo) কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, যদিও গ্যালিলিওর বক্তব্য
সঠিক ছিল যে পৃথিবী
সূর্যের চারদিকে ঘোরে। একইভাবে, বাইবেলে গণিতের (বিশেষ করে বীজগণিত) কোনো
উল্লেখ নেই। এর ফলস্বরূপ,
বিজ্ঞান শিক্ষিকা হাইপেশিয়াকে (Hypatia) পাদরি সিরিলের নির্দেশে অপমানিত হতে হয়েছিল, কারণ
তিনি গণিত শিখাতেন।
কোরানে এমন অনেক বিজ্ঞানবিরোধী
কথা রয়েছে, যেমন—পৃথিবী চ্যাপ্টা
এবং স্থির, যদিও বাস্তবতা হলো
পৃথিবী গোলাকার এবং এটি সর্বদা
নিজের কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়। এর
বিপরীতে, বেদে বিভিন্ন শাস্ত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেমন—আয়ুর্বেদ (Ayurveda), দেহবিজ্ঞান (Anatomy), রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science), সমাজবিজ্ঞান (Social
Science), আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান (Spiritual Science),
সৃষ্টি বিজ্ঞান (Origin of Life) ইত্যাদি। আর্যদের সকল দর্শন এবং
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্র বেদকে তাদের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
অতএব, শুধুমাত্র
বেদই
ঈশ্বরীয়
জ্ঞান
এবং অন্যান্য গ্রন্থ নয়।
৭. ঈশ্বরীয় জ্ঞান ঈশ্বরের গুণ, কর্ম এবং
স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া
উচিত
ঈশ্বরীয় জ্ঞানের একটি মাপকাঠি হলো
যে এতে ঈশ্বরের গুণ,
কর্ম এবং স্বভাবের বিপরীত
কোনো বিষয় থাকা উচিত নয়।
ঈশ্বর সত্যের মূর্তি, ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু, পবিত্র, জ্ঞানময়, শুদ্ধ ও মুক্ত স্বভাবের
অধিকারী এবং সর্বজ্ঞ। ঈশ্বরীয়
জ্ঞানে ঈশ্বরের এই গুণগুলোর বিপরীত
কিছু থাকা উচিত নয়।
তথাকথিত ধর্মগ্রন্থ, যেমন বাইবেল এবং
কোরানে অনেক কথা রয়েছে
যা ঈশ্বরের গুণের বিপরীত। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলে এক স্থানে বলা
হয়েছে যে ঈশ্বর ভাষার
বিভ্রান্তি ঘটিয়েছিলেন যাতে মানুষ পরস্পরের
সঙ্গে লড়াই করে। প্রশ্ন হলো,
কি ঈশ্বরের কাজ মানুষকে লড়াইয়ে
উস্কে দেওয়া? একইভাবে, ইসলামে ঈদে নিরীহ পশু
কোরবানি দেওয়া হয় এবং বিশ্বাস
করা হয় যে এতে
ঈশ্বরের সন্তুষ্টি লাভ হয়। কিন্তু
এটি কি ঈশ্বরের দয়ালু
গুণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এছাড়া, কোরান এবং বাইবেল সহ
অন্যান্য তথাকথিত ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরের গুণ, কর্ম এবং
স্বভাবের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক
বিষয় পাওয়া যায়। এর বিপরীতে, বেদ
ঈশ্বরের গুণ, কর্ম এবং
স্বভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই কারণে বেদই
একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্মগ্রন্থ।
বেদই ঈশ্বরীয় জ্ঞান: প্রমাণের ভিত্তি
এই প্রবন্ধে বর্ণিত যুক্তিগুলোর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে শুধুমাত্র বেদই ঈশ্বরীয় জ্ঞান। বেদের এই ঈশ্বরীয় জ্ঞানের সমর্থনে বেদ নিজেই সাক্ষ্য দেয়। নিম্নলিখিত শ্লোকগুলো এই সত্যকে প্রমাণ করে:
- "সবার উপাস্য, সৃষ্টি কালে সবকিছু প্রদানকারী এবং প্রলয়কালে সবকিছু ধ্বংসকারী সেই পরমাত্মা থেকে ঋগ্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ এবং যজুর্বেদ উৎপন্ন হয়েছে।"ঋগ্বেদ ১০.৯০.৯, যজুর্বেদ ৩১.৭, অথর্ববেদ ১৯.৬.১৩
- সৃষ্টি শুরুর সময়, পরমাত্মা ঋষিদের আত্মায় বিভিন্ন বস্তুর নাম বলে দিয়ে, বেদবাণীকে প্রকাশ করেছেন।" ঋগ্বেদ ১০.৭১.১
- "বেদবাণীর শব্দ ও অর্থের সম্পর্ক থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান যজ্ঞ অর্থাৎ সবার উপাস্য পরমাত্মার দ্বারা প্রাপ্ত।" ঋগ্বেদ ১০.৭১.৩
- "আমি (ঈশ্বর) এই কল্যাণকর বেদবাণী সব মানুষের কল্যাণের জন্য দিয়েছি।" যজুর্বেদ ২৬.২
- "ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ সেই পরমেশ্বর থেকে উৎপন্ন হয়েছে।" অথর্ববেদ ১০.৭.২০
- "যে বেদবাণীগুলো প্রকৃত জ্ঞান জানায়, সেগুলো সেই অতুলনীয় গুণসম্পন্ন পরমাত্মা নিজের অনুপ্রেরণায় দিয়েছেন।" অথর্ববেদ ১০.৮.৩৩
- "হে মানুষ, আমি এই বেদরূপী মাতা তোমাদের জন্য উপস্থাপন করেছি, যা সকল প্রকার কল্যাণ প্রদান করে।" অথর্ববেদ ১৯.৭১.১
- "পরমাত্মার নামই জাতবেদা, কারণ তার থেকেই বেদরূপী কাব্য উৎপন্ন হয়েছে।" অথর্ববেদ ৫.১১.২
উপসংহার
আসুন, ঈশ্বরের সত্য বার্তা বেদকে
জানুন এবং বেদের পবিত্র
বার্তাগুলিকে গ্রহণ করে আপনার জীবনকে
উন্নত করুন।
